
তুহিন হোসেন সাতক্ষীরা থেকে: পশ্চিম আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে ডুবে গেছে ২০২৫ সালের শেষ সূর্য। বিদায় ঘণ্টা বেজেছে পুরনো বছরের, স্মৃতির পাতায় জমা পড়েছে সুখ-দুঃখের নানা অম্ল-মধুর মুহূর্ত। পেছনে পড়ে রইল সাক্ষী হয়ে থাকা বহু ভাঙা-গড়ার এক উত্তাল ও ঐতিহাসিক অধ্যায়। জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিসরে বাংলাদেশের মানুষ আজ আরও একটি নতুন বছরে পা রাখছে; তবে এই পথচলা নিছক সময়ের আবর্তন নয়, বরং দু’চোখ ভরা এক বুক বড় স্বপ্নের হাতছানি।
সময়ের অমোঘ নিয়মে মহাকালের গর্ভে বিলীন হলো ২০২৫ সাল। পেছনে ফেলে গেল এক অস্থির, উত্তাল এবং একই সঙ্গে রূপান্তরের গভীর স্মৃতি। বর্ষপঞ্জির পাতা উল্টে আমরা পা রাখছি ২০২৬-এ। কিন্তু গত বছরের রক্ত, অশ্রু, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং সামাজিক ও নৈতিক যে হিসাবগুলো অমীমাংসিত থেকে গেছে, তা নতুন বছরেও আমাদের তাড়া করে ফিরবে। ২০২৫ সালটি কেবল একটি বছরের বিদায় নয়, বরং এটি ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো ও রাজনৈতিক চরিত্রের এক কঠিন পুনর্মূল্যায়নের কাল।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালটি ছিল মূলত এক গভীর রূপান্তরকাল। দীর্ঘ দেড় যুগের একতরফা শাসনের অবসানের পর নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ ছিল জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। এই সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল বিশাল—যার কেন্দ্রে ছিল রাষ্ট্র সংস্কার, মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং একটি গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা। তবে বছরের নানা প্রান্তে মিটফোর্ডে সোহাগ হত্যাকা- কিংবা উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের সেই মর্মান্তিক বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় বিপুল প্রাণহানি আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার দুর্বলতাকে বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
বছরের শেষার্ধের রাজনৈতিক ঘটনাবলি ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় একদিকে যেমন ভুক্তভোগীদের মনে ন্যায়বিচারের আশা জাগিয়েছে, তেমনি তা ভবিষ্যতের শাসকদের জন্য ক্ষমতার অপব্যবহারের করুণ পরিণতির একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে রইল। আবার ইনকিলাব মঞ্চের তরুণ নেতা শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনা আমাদের রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাবকে আবারও নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে। তবে দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ও উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
বছরের একেবারে শেষ বেলায় এসে দেশ হারিয়েছে সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে। গণতন্ত্র রক্ষা ও আপসহীন নেতৃত্বের যে উদাহরণ তিনি রেখে গেছেন, তা দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তবে ২০২৫ সালের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা। এই নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় আস্থার এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। বিগত বছরটিতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং অর্থনৈতিক চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ এখন একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা চায়। নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষাও আজ স্পষ্টÑতারা আর কোনো রুদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা চায় না।
২০২৬ সালের সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রার্থনা ও প্রত্যাশা একটাই একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ হবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং একটি টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করা। অতীতের রক্ত ও অশ্রু থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা কি একটি সুন্দর ভোরের দিকে এগিয়ে যেতে পারব? এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের আগামীর ভবিষ্যৎ। স্বাগত ২০২৬। প্রত্যাশা থাকুক শান্তি, ন্যায়বিচার ও জনগণের প্রকৃত মুক্তির। অন্ধকার কেটে আজ যে নতুন সূর্যের উদয় হয়েছে, তা এ দেশের মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি আর আশার অবিনশ্বর শক্তিরই এক জীবন্ত দলিল।
Leave a Reply