আধুনিকতার ছোঁয়ায় সাতক্ষীরা থেকে বিলুপ্তির প্রান্তে ‘কোঠা ঘর’

ফিচার সাতক্ষীরা সদর সাতক্ষীরা-জেলা সারাদেশ

মোঃ তুহিন হোসেন সাতক্ষীরা:  আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষের বসবাসের ক্ষেত্র পরিধি দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটছে। তবুও মানুষের জীবনের পথ চলায় অতীত স্মৃতিগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। অতীত স্মৃতিগুলোকে জীবনের সঙ্গী করেই মানুষের পথচলা সৌন্দর্যমণ্ডিত ও সমৃদ্ধময় হয়ে ওঠে। সাতক্ষীরায় বিভিন্ন গ্রামের মানুষের কাছে মাটির ঘর খুবই জনপ্রিয়। পরিবারের পূর্বপুরুষদের ধারাবাহিকতার বংশ পরম্পরায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ বর্তমানে তুলনামূলক খুব কমই মাটির ঘরে বসবাস করে। তবে এখনো সাতক্ষীরা জেলার কিছু উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কিছু কিছু মানুষ মাটির ঘরে বসবাস করছে। মাটির ঘরে বসবাসরত এমন পরিবার বর্তমান সময়ে খুব কমই চোখে পড়ে।
সাতক্ষীরায় কিছু মানুষ এখনো মাটির ঘরে বসবাস করছেন পরিবারের স্মৃতি আঁকরে ধরে। তালা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাটির ঘরে বসবাস করছেন এ সংখ্যা খুবই কম। কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের পূর্বপুরুষগণ মাটির ঘরেই বসবাস করতো। মাটির ঘর মূলত গ্রামের মানুষের কাছে ‘কোঠা ঘর’ নামেই বেশ প্রচলিত ছিল। মাটির ঘরেই কেটে গেছে রহিমা খাতুনের প্রায় এক জীবন। এখনো স্বামীর রেখে যাওয়া সেই মাটির ঘরই তার জগৎ। তার সাজানো গোছানো সংসারের সবকিছুর মধ্যে মাটির ঘরটিই যেনো তার কাছে শান্তিনীড়। রহিমা খাতুনের (৬৮) ভাষ্য মতে, প্রায় ৩৩ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি মাটির ঘরে বসবাস করছেন। এই মাটির ঘরটিই তার সুখ দুঃখের কেন্দ্রবিন্দু।
ঠিক একই রকম চিত্র দেখা গিয়েছে সাতক্ষীরায় কালিগঞ্জ উপজেলার রতনপুর ইউনিয়নের মুড়াগাছায় গ্রামের সেলিনা বেগমের (৬০) সারা জীবন ধরেই মাটির ঘরে বসবাস করে আসছে। এখনো তিনি তার জীবনের শেষ সময়টুকু মাটির ঘরকে কেন্দ্র করে পার করছেন। জীবনের সকল সুখ দুঃখের আলো ছায়ার সঙ্গী যেনো এই মাটির ঘর। তার মেয়ে বলেন ‘‘মাটির ঘরটিই হলো আমার মায়ের কাছে আনন্দ বেদনার সঙ্গী।’’
কিন্তু মাটির ঘরগুলোর সেই রূপ-সৌন্দর্য খুব একটা অনুভব করা যায় না। কেউ কেউ হয়তো পরিবারের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি রক্ষার্থে ঘরগুলো এখনো রেখে দিয়েছেন। কিছু কিছু ঘর পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। আবার কোনো কোনো ঘরে বসবাস করছেন এখনো। তবে বেশির ভাগই ঘরই এখন পরিবারের স্বজনদের স্মৃতি অটুট রাখতে সযত্নে রেখে দেওয়া হয়েছে।
এ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এক সময় প্রচুর মাটির ঘর দেখতে পাওয়া যেত। তখন একমাত্র ঠিকানা ছিল মাটির ঘর। ঘরগুলো মজবুত, টেকসই ও বসবাসের উপযোগী ছিল। ঘরগুলোর পুরুত্ব ছিল অনেক। এই ঘর তৈরিতে ব্যবহার হতো তুষ, চুনা ও মাটি। মাটির সঙ্গে ভালোভাবে তুষ ও চুনাকে মিশিয়ে তারপর কাঠের তৈরি খুঁটিগুলোর উপর দিয়ে মাটি লেপে লেপে নিখুঁতভাবে তৈরি করা হতো ঘর।  রতনপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা সাংবাদিক জি এম রাজু আহমেদ বলেন, ‘‘বাপ-দাদার আমল থেকেই মাটির ঘরে আমরা বসবাস করতাম। তবে বর্তমানে টিনের ঘরে বাস করি।  বাপ-দাদার স্মৃতি রক্ষার্থে মাটির ঘর রেখে দিয়েছি। ভেঙ্গে নতুন ঘর দেইনি। ‘আমার বাবা দীর্ঘদিন ধরে মাটির ঘরে বসবাস করেছে। ছোটবেলা থেকেই দেখতাম আমার বাবা মাটির ঘরেই বসবাস করত। তীব্র গরমের দিনে মাটির ঘর প্রচন্ড শীতল থাকে।’’ এক কৃষক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘‘জন্মের পর থেকেই দেখে আসছিবাবা-মা মাটির ঘরে বসবাস করতো। আমাদের পারিবারিক ও সংসারের সকল সুখ-দুঃখের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই ঘর। যখন ঈদের সময় ঘনিয়ে আসতো তখন আম্মা-আব্বাকে দেখতাম সম্পূর্ণ মাটির ঘরটি পুনরায় লেপে দিত। প্রতিবছরের ঈদের আনন্দের সাথে মাটির ঘরের নিখুঁত চাকচিক্যপূর্ণ অপরুপ দৃশ্য আমাদের ঈদের আনন্দকে আরও প্রাণচঞ্চল করে তুলতো।’’
সাংবাদিক কাজী মারুফ হোসেন বলেন, ‘‘মাটির ঘর আমাদের গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। আগেকার দিনে যখন টিনের ঘর এবং দালান কোঠার প্রচলন ছিল না তখন মাটির ঘরেই মানুষ বসবাস করতো। আমাদের গ্রামাঞ্চলের মানুষের প্রবাহমান জীবনের গতিধারায় এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হল মাটির ঘর। বর্তমানে মাটির ঘর তেমন একটা খুব চোখে না পড়লেও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় মাটির ঘরেই এখনো কেউ কেউ বসবাস করছে। গ্রামাঞ্চলে মাটির ঘরে বসবাসরত মানুষের মাটির ঘরকে কেন্দ্র করে জীবনের সুখ-দুঃখের অনেক স্মৃতি মিশে রয়েছে।’’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *