
নিজস্ব প্রতিনিধি, শাহিনুর রহমান (সাতক্ষীরা): তীব্র তাপদাহ আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলা ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চরম নাজেহাল হয়ে পড়েছে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ। গত কয়েকদিন ধরে চলা এই নজিরবিহীন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ জনজীবন, ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা ও শিল্পোৎপাদন। একদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী দাবি করছেন দেশে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে।
সরেজমিনে সাতক্ষীরা সদরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তীব্র গরমে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটা বড় সময় বিদ্যুৎহীন কাটাচ্ছেন। শহরের কাটিয়া, পলাশপোল, ইটাগাছা কিংবা সুলতানপুরের মতো আবাসিক এলাকাগুলোর পরিস্থিতি যেমন নাজুক, তেমনি উপজেলার গ্রামীণ ফিডারগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। ঝাউডাঙ্গা, বল্লী, ফিংড়ী, বাশদহা কিংবা কুশখালী ইউনিয়নে দিন-রাত মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন। রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় একদিকে যেমন বৃদ্ধ ও শিশুরা চরম অসুস্থ হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা।সম্প্রতি সরকারের নীতি নির্ধারক ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, দেশে চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। তবে মন্ত্রীর এই আশ্বাসের সাথে সাতক্ষীরার বাস্তব চিত্রের কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। স্থানীয়দের প্রশ্ন— উৎপাদন যদি পর্যাপ্তই হয়, তবে সাতক্ষীরার মানুষকে কেন এই তীব্র গরমে দিনের পর দিন এমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে?
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও ওজোপাডিকো মিলিয়ে পুরো জেলায় বর্তমানে বিদ্যুতের যে চাহিদা, তার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। প্রতিদিন কয়েক ডজন মেগাওয়াট ঘাটতি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সরবরাহব্যবস্থা। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে এই লোডশেডিং করছেন।বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সাতক্ষীরা বিসিক শিল্পনগরীসহ সদরের শত শত ছোট-বড় কারখানা, লেদ ও চালকলের উৎপাদন প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে। কারখানা সচল রাখতে না পারায় ব্যবসায়ীরা যেমন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তেমনি খেটে খাওয়া শ্রমিকদের অলস বসে থাকতে হচ্ছে। এছাড়া, তীব্র গরমে মাঠের ফসল বাঁচাতে যেখানে সেচ পাম্প চালানো জরুরি, সেখানে বিদ্যুৎ না থাকায় আমন ও রবি শস্যের আবাদ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।
ঘন ঘন লোডশেডিং আর অসহ্য গরমের কারণে এলাকায় ডায়রিয়া, ভাইরাস জ্বর ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন গরমজনিত রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। ফলে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা দিন দিন উপচে পড়ছে। লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর দিয়ে জরুরি চিকিৎসাসেবা সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ চিকিৎসা কার্যক্রম।
স্থানীয় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ অনতিবিলম্বে এই ‘বিদ্যুৎ মহামারি’ থেকে মুক্তি পেতে এবং সাতক্ষীরা অঞ্চলে সুষম বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
