পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার পরিবেশ সংরক্ষণে পাইকগাছা পৌরসভার

জাতীয় ফিচার সাতক্ষীরা-জেলা সারাদেশ

কাজী সোহাগ পাইকগাছা : খুলনার পাইকগাছা পৌরসভায় আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব মনুষ্য বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট বা সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালু হয়েছে। পৌরবাসীর স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে, ওয়াটারএইড ও নবলোক এর সহায়তায় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। পৌরসভায় এ পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার বা সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট হলো একটি অত্যাধুনিক ব্যবস্থা। যার মাধ্যমে মানব সৃষ্ট মলমূত্র, গোসলের পানি ও গৃহস্থালির বর্জ্যমিশ্রিত দূষিত পানি বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশোধন করে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ পানিতে পরিণত করা হয়। এটি পরিবেশ দূষণ ও পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।
পয়ঃবর্জ্য শোধনাগারের মূল ধাপসমূহ প্রাথমিক শোধন এতে ছাঁকনি ও থিতানো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্জ্য পানির ভারী ও ভাসমান কঠিন বস্তু (যেমন- পলিথিন, বালু) আলাদা করা হয়। মাধ্যমিক শোধন এই ধাপে ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে জৈব দূর্বল পদার্থ ও ময়লা পচিয়ে বায়োলজিক্যাল বা রাসায়নিক উপায়ে পানিকে প্রায় সম্পূর্ণ পরিষ্কার করা হয়। তৃতীয় বা উন্নত শোধন বিশেষ প্রক্রিয়ায় পানি থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, ক্ষতিকর রোগজীবাণু ইত্যাদি শতভাগ দূর করা হয়। এরপর পরিশোধিত পানি নদী বা জলাশয়ে নিরাপদে ফেলা যায়। অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য সরাসরি নদীতে বা খালে পড়লে জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয় ও নদীর পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। শোধনাগার ব্যবহারের ফলে এই দূষণ কমে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উপচে পড়া ময়লা ও দুর্গন্ধ দূর করে এটি পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর রাখে। শোধিত পানি কৃষিকাজ, শিল্প-কারখানা বা রাস্তার ধুলোবালু পরিষ্কারের মতো কাজে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব।
খুলনার পাইকগাছায় প্রথম বারের মতো নির্মিত হয়েছে জাপানি উন্নত প্রযুক্তির পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার। প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে শিববাটী সড়কের পূর্ব পাশে পৌর ভবনের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে পয়ঃবর্জ্য শোধনাগারটি। দাতা সংস্থা ওয়াটার এইড বাংলাদেশ এর আর্থিক সহায়তায় নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নবলোক পরিষদ। শোধনাগারটি তদারকি ও দেখভাল করবে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে শোধনাগার থেকে ৬০ হাজার লিটার বর্জ্য শোধন করা হয়েছে। শোধনাগারের কার্যক্রম ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছে।
কিছু দিন আগে ও মানব বর্জ্য অপসারণ কিংবা শোধনের কোন ব্যবস্থা ছিল না প্রথম শ্রেণির এ পৌরসভায়। ফলে মানব বর্জ্য অপসারণ নিয়ে নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হতো পৌরবাসিকে। খরচ এবং সময় দুটোই বেশি লাগতো অপসারণের কাজে। বর্জ্য রাখার নির্দিষ্ট জায়গার অভাবে নানা সমস্যায় পড়তেন অনেকেই। অনেকের বাসাবাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ড্রেন হয়ে চলে যেত নদ-নদী ও খাল-বিলে। এতে পরিবেশ দূষণ হওয়ার পাশাপাশি চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি ছিলো।
ওয়াটার এইড বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধি সুমন সাহা বলেন, ১৫ হাজার লিটার বর্জ্য ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন শোধনাগারটি নির্মাণে প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এটি নির্মাণে জাপানি প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে। বর্জ্য সংগ্রহ করার জন্য ৫০০ লিটার এবং ১০০০ লিটার বর্জ্য বহন সক্ষম দুটি ভেকুট্যাকচার গাড়ি রয়েছে। বাড়িতে কিংবা প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হবে পয়ঃ বর্জ্য। এরপর সেগুলো ৪ টি ধাপে শোধন করা হয়। শেষ ধাপে শোধনকৃত পানি পাইপের মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে যায়। বর্জ্য অপসারণের জন্য লিটার প্রতি ১ টাকা খরচ হবে বলে জানান দাতা সংস্থার এ প্রতিনিধি।
পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের ফলে এখন থেকে পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকবে না এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্ট পৌর এবং সংস্থা কর্তৃপক্ষ। পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন এর আগে এলাকায় পয়ঃ বর্জ্য অপসারণের কোন আধুনিক ব্যবস্থা ছিল না। এখন থেকে খুব সহজে এবং স্বল্প খরচে বাসাবাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠানের পয়ঃবর্জ্য অপসারণ করতে পারবেন পৌরসভার বাসিন্দারা। এটি সম্পূর্ণ পরিবেশ বান্ধব। এছাড়া এলাকার নদ-নদী ও খালবিল দূষণ মুক্ত থাকবে, স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকবে না এবং রোগ বালাইয়ের প্রকোপ কমে আসবে।

Share this news as a Photo Card

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *