সাতক্ষীরা জেলায় সাংবাদিক কার্ড ইস্যু করার পরে আবার কার্ডটি বাতিল করলেন জেলা প্রশাসক


নিজস্ব প্রতিনিধি : ফেসবুক পেজ ও অনিবন্ধিত প্ল্যাটফর্মের নামে ভুয়া সাংবাদিক পরিচয়পত্র ইস্যু করে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেওয়া সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন অবশেষে তুমুল প্রতিবাদ ও গণমাধ্যমের চাপের মুখে একটি কার্ড বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে সংবাদ সংগ্রহের নামে বিতর্কিতভাবে রাজনৈতিক কর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যক্তিদের হাতে কার্ড তুলে দিয়ে জেলা প্রশাসন কার্যত পেশাদার সাংবাদিক সমাজের সঙ্গে প্রহসন করেছে- এমন অভিযোগ এখন সর্বত্র। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মিজ্ আফরোজা আখতারের স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে অবশেষে স্বীকার করা হয়, ফেসবুকভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে জড়িত আবু মুহিত গাজীর ইস্যুকৃত কার্ড অবৈধ।গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সাংবাদিক কার্ড বিতরণ রেজিস্টারের ৪৫৮ নম্বর সিরিয়ালের আবু মুহিত গাজীর কাগজপত্র সঠিক না থাকায় তার আবেদন প্রাথমিকভাবে বাতিল হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সেই ব্যক্তির হাতেই পরে ১১৫৯৬২ নম্বর কার্ড পৌঁছে যায়।
প্রশ্ন উঠেছে- বাতিল হওয়া আবেদনকারীর হাতে কার্ড গেল কীভাবে? এই অনিয়মের দায় কে নেবে? প্রশাসনের এই ব্যর্থতা ও দায়িত্বহীনতা নিয়ে এখন জেলাজুড়ে তীব্র আলোচনা চলছে।গণবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ওই কার্ড ব্যবহার করে কোনো ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
‘চেকলিস্ট’ আর বাস্তবতার ভয়াবহ বৈপরীত্য
এর আগে জেলা প্রশাসক দাবি করেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত চেকলিস্ট অনুযায়ী শুধুমাত্র অনুমোদিত জাতীয়, স্থানীয় ও নিবন্ধিত অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকদেরই কার্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সেই বক্তব্য ছিল পুরোপুরি বিভ্রান্তিকর। কারণ- ফেসবুক পেজের এডমিন, রাজনৈতিক নেতা ও অনিবন্ধিত তথাকথিত টিভি চ্যানেলের কর্মীরাও নির্বিঘ্নে কার্ড পেয়েছেন। এমনকি বাতিল ঘোষণার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে গণবিজ্ঞপ্তিতে ‘সাংবাদিক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য চরম অপমান।সাংবাদিক সমাজে ক্ষোভের বিস্ফোরণ
অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব ও অদক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সাতক্ষীরার কর্মরত সাংবাদিকরা রীতিমতো ফুঁসে উঠেছেন।
বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠার পরই জেলা প্রশাসন নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়। এই কার্ড ইস্যু- বিতরণ প্রক্রিয়ায় পেশাদারিত্ব নয় বরং রাজনৈতিক পরিচয় ও তদবিরই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে টাঙানো তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়- অনেক অপেশাদার ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে বৈধ কার্ড সংগ্রহ করেছেন।
এর মধ্যে আবু মুহিত গাজী ছাড়াও ‘গাঙচিল টিভি’ ও ‘এনএএন টিভি’র মতো নিবন্ধনহীন মাধ্যমের কর্মীরাও অনুমতি পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।এতে স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়, কার্ড যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় চরম অবহেলা ও অনিয়ম হয়েছে।সাংবাদিক নেতারা বলছেন- নির্বাচন কমিশন যেখানে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের কথা বলছে, সেখানে সাতক্ষীরায় জেলা প্রশাসন নিজেরাই সেই নীতিমালাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। দলীয় সুবিধাভোগীদের হাতে কার্ড তুলে দিয়ে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পথ তৈরি করা হয়েছে। অনেকে সরাসরি জেলা প্রশাসককে এই অনিয়মের জন্য দায়ী করছেন। সাতক্ষীরা জেলার একাধিক সাংবাদিক বলেন, প্রকৃত সাংবাদিকদের ওপর যত নিয়ম-কানুন আর ভুয়াদের জন্য সব দরজা খোলা- এটা চলতে পারে না। ভেতরে কী চলছে, তা তদন্ত ছাড়া জানা যাবে না। এ বিষয়ে জানতে বুধবার বেলা সাড়ে ১২টায় জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মিজ্ আফরোজা আখতারের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *