সাতক্ষীরায় প্রাণসায়র খাল ময়লার ভাগাড়েই পরিণত হবে কী?


আজকের সাতক্ষীরা দর্পণ ডেস্ক: সাতক্ষীরা শহরের প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত ‘প্রাণসায়র খাল’ আজ অস্তিত্ব সংকটে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল হতাশাজনক নয়, বরং প্রশাসনের কার্যকারিতার ওপর এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন। প্রশাসনের বারবার দেওয়া নিষেধাজ্ঞা আর পরিবেশবাদীদের আকুতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একদল অসাধু ব্যবসায়ী ও অসচেতন নাগরিক খালটিকে বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত করেছে। বিশেষ করে শহরের বড় বাজার ব্রিজের দক্ষিণ পাশে যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে হোটেলের উচ্ছিষ্ট ও মাংসের দোকানের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, তা রীতিমতো অপরাধমূলক ধৃষ্টতা।
শহরের বুক চিরে প্রবাহিত এই খালটি সাতক্ষীরার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০০ সালের ভয়াবহ বন্যায় এ খালটি শহরবাসীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দীর্ঘদিন দূষণ ও দখলের কারণে খালটি মরে গেলেও, খালটি আবারও প্রবাহমান হয়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮৪০ সালে প্রাণনাথ রায় চৌধুরী কলকাতার সঙ্গে নৌপথে যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের উদ্দেশ্যে এই খাল খনন করেছিলেন। শহরের বুক চিরে প্রবাহিত এ খাল শুধু জলধারাই নয়, শহরের সৌন্দর্য ও ভারসাম্যের অন্যতম প্রতীক।
কয়েক মাস আগেও যে খালে জোয়ার-ভাটার প্রবাহ ছিল, আজ সেখানে পলিথিন আর পচনশীল বর্জ্যের পাহাড়। ‘রাধুনী রান্না হোটেল’ সহ স্থানীয় বেশ কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ি এই খালের টুঁটি চেপে ধরেছে। প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে খালের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো শহর তলিয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তার দায় কে নেবে?
মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবই দখলদার ও দূষণকারীদের বেপরোয়া করে তুলেছে। আইন যখন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন অপরাধীরা ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করে। প্রাণসায়র খালের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটছে। প্রাণসায়র খালকে বাঁচাতে হলে এখন আর শুধু ‘সতর্কবার্তা’ যথেষ্ট নয়। আমাদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো হলো: ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা: অবিলম্বে দূষণকারী হোটেল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। বারবার সতর্ক করার পরও যারা বর্জ্য ফেলা বন্ধ করেনি, তাদের বাণিজ্যিক লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। পৌরসভাকে নির্দিষ্ট বিরতিতে খাল সংলগ্ন এলাকা থেকে ময়লা সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যাতে কেউ খালে ময়লা ফেলতে বাধ্য না হয়। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে নজরদারি বাড়ানো এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
জেলা সাংবাদিক এসোসিয়েশন সাতক্ষীরা এর যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক মোঃ কাজী মারুফ হোসেন বলেন, “প্রাণনাথ বাবুদের খননকিত প্রাণসায়রের খাল সাতক্ষীরাবাসির জন্য আশীর্বাদ। প্রাণসায়রের খালে পড়ে স্থাপিত কসাইখানা সাতক্ষীরাবাসীর জন্য বিপদ সংকেত আবার যদি একই স্থানে পুনঃস্থাপন করা হয়। তবে পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশন সহ সাতক্ষীরা শহরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে। পৌরসভা কর্তৃক কসাইখানা অন্যত্র স্থানান্তর করা সমুচিত।”বাজার এলাকায় বর্জ্য বিশেষ করে কসাইখানার গরু, ছাগলের বর্জ্য কোনভাবে যাতে প্রাণ সায়েরের খালে না পড়ে মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি।
প্রাণসায়র খাল সাতক্ষীরার ঐতিহ্য ও প্রকৃতির এক অমূল্য দান। প্রশাসনের উদাসীনতা আর গুটি কয়েক মানুষের লোভের বলি হতে পারে না এই সম্পদ। আমরা আশা করি, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ঘুম ভেঙে জেগে উঠবে এবং প্রাণসায়রকে তার হারানো যৌবন ফিরিয়ে দিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। অন্যথায়, অচিরেই এই ঐতিহ্যবাহী খালটি শহরের একটি স্থায়ী এবং বিষাক্ত ড্রেনে পরিণত হবে।

,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *