
নিজস্ব প্রতিনিধি: হাতের মেহেদীর রং শুকানোর আগেই বিধবা হলো সদ্য বিবাহিত গৃহবধূ তানিয়া খাতুন। মাত্র ২৫দিন আগে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফয়জুল্যাপুর গ্রামের মো. আমান আলী মোল্লার কন্যা তানিয়া খাতুনের সাথে বালিথার এন্দুর কান্ধা এলাকার আব্দুল হাইয়ের একমাত্র পুত্র আল মুজাহিদ(২৫) এর বিবাহ সম্পন্ন হয়। আল মুজাহিদ ছিল বহুমুখী প্রতিভার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সম্প্রতি কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করে ফিংড়ী মাদ্রাসা ও সাতক্ষীরার আল কুরআন একাডেমিতে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এর পাশাপাশি সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন।দুই ভাই বোনের সে ছিল বড়।মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা বাবা মায়ের একমাত্র পুত্র সন্তান হওয়ায় আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন ছিল। মানুষকে খুব সহজেই আপন করে নেওয়ার অসাধারণ ক্যারিশম্যাটিক দক্ষতা ছিল তার। খুব সহজে সবাই কে আপন করে নিতো। অনেক ইচ্ছা ছিল তার। লেখা পড়া শেষ করে চাকরি করবে, বেতন পাবে তারপর বিয়ে করবে। মা বাবাকে নিয়ে সংসারের হাল ধরবে। অবশেষে চাকরি হলো, বেতনও পেল।তার ক্রিয়েটিভ কাজে মানুষের মন জয় করে বেশ প্রশংসা পায়। কিছু দিন আগে তার মা খোঁজ খবর নিয়ে হাজির ফয়জুল্যাপুর গ্রামের আমান আলী মোল্লার বাড়িতে। আমানের দুই মেয়ে বড় মেয়ে তানিয়া খাতুন স্থানীয় একটি বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং ছোট মেয়েটা শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী। মুজাহিদের মায়ের জোর দাবি আপনার মেয়েটা আমাদের খুব পছন্দ। আমার ছেলের জন্য নিতে চায়।তিনি কোন অজুহাতে দেখতে চান না। মেয়েটা তাদের দিতেই হবে। অনেক চেষ্টা করে তাকে ফিরাতে না পেরে ছেলেটার সম্পর্কে সবকিছু জেন শুনে বুঝে মাত্র ২৫ দিন আগে তানিয়ার সাথে মুজাহিদের বিয়ে হয়। মুজাহিদ বিয়ের পর এ মাসের বেতন পেয়ে বাড়িতে নতুন ফ্রিজ কিনবে। ৯ মার্চ বেতনের টাকা পেয়ে পরদিন ১০মার্চ বিকালে সাতক্ষীরায় ফ্রিজ কিনতে যায়। ফ্রিজ কিনে আনার পর শো-রুমের লোক যখন তার বাসায় ফ্রিজটি সেট আপ করছে ঠিক তখন হঠাৎ মাথায় তীব্র ব্যথা ও খিচুনি হয়। সাথে সাথে তাকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তার অবস্থা খারাপ হলে তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে (সামেক) নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। তখন রাত আনুমানিক সাড়ে আটটা বাজে। তার হঠাৎ স্ট্রোক জনিত কারনে মৃত্যুতে হাজারো রঙিন স্বপ্নের জাল বুনে স্বামীর ঘরে থাকা সদ্য বিবাহিত স্ত্রী তানিয়া খাতুনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। এখনো তার হাতের মেহেদীর রঙ শুকায়নি।বিয়ের অনুষ্ঠানে লাগানো মেহেদীর লাল রং জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। স্বপ্নের রংগুলো ডানা মেলে বাড়তে শুরু করার আগেই সব স্বপ্ন ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। কিশোরী তানিয়া খাতুন এখনো স্বামী- সংসার কি তা ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারেনি অথচ তার আগেই বিধবা হতে হলো। শোকের সাগরে চোখের লোনা জলে ভেসে গেল তানিয়ার হাজারো রঙিন স্বপ্নের ডালপালা। আল মুজাহিদ আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তানিয়া কি নিয়ে বাঁচবে? কি হবে তার ভবিষ্যত? আমার প্রতিবেশী ছোট ভাই আমান আলী মোল্লার জামাতা ছিল আল মুজাহিদ। কথা হয় আমান আলীর সাথে। জিজ্ঞেস করি- জামাতা হিসেবে কেমন ছিল মোজাহিদ ও তার পরিবার? এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন - একজন মেয়ের পিতা হিসেবে যেমন জামাতা চেয়েছিলাম আল্লাহর রহমতে তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো ছিল। আর বেয়াই বেয়াইনের কোন তুলনা হয়না। তাদের মতো পরিবারে আত্মীয়তা করা আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। এত সুন্দর পরিবার খুব কম মেয়ের কপালে জোটে। আল মুজাহিদের এভাবে চলে যাওয়াটা তার স্ত্রী, বাবা মা, আত্মীয় স্বজন,সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব তথা সমাজের অপূরনীয় ক্ষতি হলো। তার শূন্যস্থান পুরন হওয়ার নয়। তবুও আল্লাহ শূন্য স্থান পছন্দ করেন না। নিশ্চয় ভালো কিছু হবে ইনশাআল্লাহ। আল মুজাহিদের এভাবে চলে সবাইকে ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দেওয়াটা মেনে নেওয়াটা মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু নিয়তির উপর কারোর হাত নেই। তার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত, আমরা সবাই হতবাক হতবিহবল কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মুজাহিদের মতো উদীয়মান তরুণদের আজকের দিনে আমাদের বড্ড বেশি দরকার ছিল। দেশ ও জাতিকে অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। তার অনেক বড় স্বপ্ন ছিল। সবাই কে শোক সাগরে ভাসিয়ে এভাবে অকালে চলে যাওয়ায় তার জানাজা নামাজে সহকর্মী শিক্ষক, আত্মীয় স্বজন,সাংবাদিক, কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সহপাঠীসহ সকল শ্রেণি পেশার হাজারো মানুষ অংশ গ্রহণ করে। দোয়া করি আমাদের সকলের প্রিয় আল মুজাহিদকে আল্লাহ জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান বানিয়ে দেন এবং তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী তানিয়াসহ তার পরিবারের সবাইকে শোক সইবার শক্তি দান করুন আমিন।