
আজকের সাতক্ষীরা দর্পণ ডেস্ক: কালিগঞ্জ ও আশাশুনি উপজেলা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-৩ সংসদীয় আসন। এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৭৬১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫০ হাজার ২৬৭ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৯১ জন। ভোট গ্রহণ হবে মোট ১৬৫টি কেন্দ্রে-কালিগঞ্জে ৭৯টি ও আশাশুনিতে ৮৬টি।
ভোটকক্ষের সংখ্যা ৯২৭টি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ছয়জন প্রার্থী। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মুহাদ্দিস রবিউল বাশার দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে, বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আলহাজ কাজী আলাউদ্দিন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।
বিএনপি থেকে মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন ডা. শহিদুল আলম (ফুটবল)। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ওয়েজ কুরণী (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির প্রার্থী আলিপ হোসেন (লাঙ্গল) এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমজেপির প্রার্থী রুবেল হোসেন (রকেট) প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। এলাকা ঘুরে ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক সমীকরণ বেশ জটিল।
বিশেষ করে বিএনপির রাজনীতি স্থানীয়ভাবে স্পষ্টভাবে দুই ভাগে বিভক্ত। একাংশ দলীয় প্রার্থী কাজী আলাউদ্দিনের পক্ষে থাকলেও, আরেক অংশ প্রকাশ্যে বা নীরবে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. শহিদুল আলমকে সমর্থন করছেন। এই বিভক্তি বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণাকে কিছুটা দুর্বল করে দিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী কাজী আলাউদ্দিন এলাকায় দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ।
দলীয় রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং বিএনপির ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংকের একটি অংশ এখনো তাঁর পাশেই আছে বলে জানান দলটির স্থানীয় নেতারা। ব্যক্তিগতভাবে শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ হিসেবেই তাঁকে চেনেন অনেক ভোটার। তবে এবারের নির্বাচনে তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলীয় ঐক্য। বিএনপির ভেতরের এই বিভাজন কাটিয়ে ভোটারদের কতটা একত্র করা যাবে-সে বিষয়টিই এখন তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. শহিদুল আলমের পক্ষে এলাকার একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কিছু নেতা-কর্মীকেও সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ ও ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশ থেকেই তাঁদের এই অবস্থান বলে আলোচনা রয়েছে। তবে সাধারণ ভোটারদের বড় অংশ মনে করছেন, এসব তৎপরতা ভোটের ফলাফলে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না।
তাঁদের মতে, ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ভোটার আবার জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাদ্দিস রবিউল বাশারকে ব্যক্তিগতভাবে সৎ, ধর্মভীরু ও যোগ্য মানুষ হিসেবে দেখছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ভোটার জানান, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও আচরণ এলাকার মানুষের মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি করেছে।
সে কারণেই দিন দিন তাঁর পক্ষে সমর্থন বাড়ছে বলে তাঁদের ধারণা। স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. শহিদুল আলমের ক্ষেত্রেও ভোটারদের একটি অংশ ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার কথা বলছেন। চিকিৎসক হিসেবে দীর্ঘদিন মানুষের পাশে থাকার কারণে তাঁর প্রতি মানুষের সহানুভূতি রয়েছে বলে জানান কয়েকজন ভোটার। তবে একই সঙ্গে তাঁর সমর্থকরাও স্বীকার করেন, ভোটের মাঠে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা সহজ হবে না।
সাতক্ষীরা-৩ আসনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন হিন্দু প্রবীণ ভোটার জানান, তাঁরা অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার ভেবেচিন্তে ভোট দিতে চান। তাঁদের ভাষায়, ‘স্বাধীনতার পর থেকে অনেক শাসনকাল দেখেছি। এবার আমরা নিরাপত্তা আর যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে ভোট দিতে চাই। শেষ বয়সে হলেও পরিবর্তন দেখতে চাই।’
এলাকার একটি বড় অংশের ভোটার এখনো প্রকাশ্যে কোনো পক্ষ নিচ্ছেন না। এই নীরব ভোটারদের নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরব ভোটই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক ভোটারের ধারণা, মূল লড়াই হতে পারে ত্রিমুখি। আবার কেউ কেউ মনে করে লড়াই হবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে।
তবে বিএনপির ভোট শেষ মুহূর্তে কতটা একত্রিত হয়, সেটিও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে সাতক্ষীরা-৩ আসনে এবারের নির্বাচন কেবল দল বনাম দলের লড়াই নয়। এখানে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, দলীয় বিভাজন, অতীত অভিজ্ঞতা ও ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ-সবকিছু মিলেই ফল নির্ধারিত হবে। শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে জয় আসে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্তই।