
আজকের সাতক্ষীরা দর্পণ ডেস্ক: সাতক্ষীরার শ্যামনগর আর আশাশুনির উপকূলীয় জনপদে এখন বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘খালি কলসি’। গত বর্ষায় পলিথিন বিছিয়ে কিংবা ড্রামে ভরে পরম মমতায় রাখা বৃষ্টির জলটুকুও মাঘের এই খটখটে শুকনো দিনে তলানিতে ঠেকেছে। এই তীব্র সংকটের সমাধান হিসেবে এখন বড় ভরসা হয়ে উঠছে অত্যাধুনিক ‘সৌরচালিত রিভার্স অসমোসিস (জঙ) প্রযুক্তি’। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এখন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বড় পরিসরে লোনা পানিকে মিঠা করার প্রযুক্তি স্থাপন করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ দেখাচ্ছে।
শ্যামনগর উপজেলার একমাত্র দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা। ওই ইউনিয়নের চাঁদনীমুখা গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের লড়াইয়ের চিত্র। এখানকার মানুষের প্রতিদিনের কাজ মানেই লোনা জলের আগ্রাসন থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। গ্রামের দিনমজুর পরিবারের গৃহবধূ সেলিনা খাতুনের বাড়ি গেলেই দেখা যায় এক অদ্ভুত দৃশ্য। তিনি তার ঘরের কাঁচা মেঝে আর বারান্দায় বড় বড় গর্ত খুঁড়েছেন। গত বর্ষার সময় সেই গর্তে পুরু পলিথিন বিছিয়ে সিমেন্ট শিটের চালের জল ধরে রেখেছিলেন। ঘরের ভেতরেই সেই গর্তের ওপর তক্তা বিছিয়ে, তার ওপর বিছানা পেতে কোনোমতে রাত কাটান তিনি।
মাঘের সকালে শূন্য কলসি হাতে গর্তের দিকে তাকিয়ে মহিলারা বলেন, বানের পানি তো আমাগো ভিটেমাটি সব কেড়ে নিয়ে গেল গো, এখন এই নোনা পানিই কি আমাগো শেষ কপাল? ঘরের মদ্যি গর্ত করে পানি রাখলাম, তা-ও তো শেষ হওয়ার পথে। আর কদিন যাবে এই পানি দিয়ে? এরপর তো কলসি নিয়ে আবার সেই মাইলের পর মাইল ছুটা লাগবে। আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ নেই আমাগো। বিলকিসের ভাষায়, ট্যাংকি কেনার টাকা পাবো কই? এই ককসিটই আমার সম্বল। বর্ষার সময় ককসিটের এই বাক্সে বৃষ্টির পানি ধরে রাখি। কিন্তু মাঘ আসতি না আসতি বাক্স সব খালি। এখন এক ড্রাম পানি কিনতে ৪০ টাকা লাগে। চাল কিনমু না পানি কিনমু, সেই চিন্তায় রাত্রি ঘুম হয় না। পানির টাকা যোগাতে ভাতের পাত থেকে খাবার কমাতি হচ্ছে।’
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাঁতিনাখালীর মহাসিনের হুলা নামক স্থানে নারীরা বদলে বেঁধে যাচ্ছিলেন সুপেয় পানি সংগ্রহে। গ্রামের ষাটোর্ধ্ব সোহরাব গাজী দাঁড়িয়ে দেখছিলেন নারীদের পানি সংগ্রহের যুদ্ধ। তিনি ক্ষোভের সুরে বলেন, আমাদের ছোটবেলায় এমন ছিল না। পুকুরের পানি খেয়ে মানুষ বাঁচত। এখন আকাশ পানে চেয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। বর্ষাকালে একটু জান বাঁচে, কিন্তু শীত আসলে মনে হয় গলায় নুন লেগে আছে। সরকার কত কিছু দেয়, কিন্তু আমাদের এই তেষ্টা মেটানোর কেউ নেই। দলবদ্ধ ভাবে সুপেয় পানির সংগ্রহে যাওয়া নারীরা বলেন, ‘সারাদিন যে কাজ করি, তার অর্ধেক সময় যায় পানির পেছনে। চার-পাঁচ মাইল হেঁটে যখন দুই কলসি পানি আনি, তখন মনে হয় হাড়গোড় সব ভেঙে যাচ্ছে। এই শীতেও পানির জন্য আমাদের ঘাম ঝরে। নোনা পানিতে গোসল করলে গা চুলকায়, ঘা হয়। কিন্তু পানি কই? আমরা কি এভাবেই শেষ হয়ে যাবো? বলে সংশয় প্রকাশ করেন তারা।
উপকূলের এই চিত্র কেবল দাতিনীখালী কিংবা চাঁদনীমুখাতে নয়, বরং শ্যামনগর ও আশাশুনির প্রতিটি গ্রামে আজ একই দৃশ্য। আইলা, আম্পান আর ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড়ে নোনা পানি লোকালয়ে ঢুকে সব মিষ্টি পানির উৎস নষ্ট করে দিয়েছে। মাটির নিচের স্তর এখন লবণে পূর্ণ। টিউবওয়েল চাপলে নোনা জল ওঠে, যা মুখে নেওয়া যায় না। বর্তমানে দারিদ্র্যের কারণে এই এলাকায় এখন এক গ্লাস মিঠা পানি পাওয়া আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো কঠিন বিষয়। বাড়ির পুরুষেরা কাজে গেলে নারীদের প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় চলে যায় কেবল এক কলসি পানি সংগ্রহের পেছনে। মাইল মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মাথায় করে পানি আনতে গিয়ে বয়স্ক নারীদের কোমর ও মেরুদ-ের ব্যথায় পঙ্গু হওয়ার দশা হয়েছে।
বিপর্যয়ের এই পরিস্থিতিতে আশার আলো দেখাচ্ছে আধুনিক ‘পানি পরিশোধন প্ল্যান্ট’। চীনা প্রতিষ্ঠান সিসিইসিসি-এর নির্মিত এই প্ল্যান্টটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও বেসরকারি সংস্থা লিডার্সের সমন্বিত উদ্যোগে চালু করা হয়েছে। এখানে ব্যবহৃত ‘রিভার্স অসমোসিস’ প্রযুক্তি সম্পর্কে দায়িত্বরত চীনা প্রকৌশলী ওয়াং বাইলু বলেন, এই ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণভাবে সৌরশক্তিতে পরিচালিত। এটি লোনা পানি থেকে লবণ ও ক্ষতিকর সব উপাদান দূর করে সরাসরি বিশুদ্ধ ও পানযোগ্য পানি সরবরাহ করে। যেহেতু এতে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না, তাই এটি উপকূলীয় এলাকার জন্য খুবই সাশ্রয়ী। তিনি আরও জানান, সরকারি সহযোগিতায় পর্যায়ক্রমে এই প্রযুক্তি সারা উপকূলে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এবিষয়ে লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মন্ডল বলেন, এ বিষয়ে লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মন্ডল বলেন, “উপকূলের মানুষকে বাঁচাতে হলে সহায়তার পরিধি ও কৌশল আরও বাড়াতে হবে। আরও বেশি মানুষ যাতে এই সেবার আওতায় আসে, সেজন্য আমরা আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও সরকারের সাথে সমন্বয় করে উপকূলের প্রতিটি দুর্গম গ্রামে পানির উৎস পৌঁছে দেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের প্রস্তাব করছি। বিশেষ করে সামাজিক ও কমিউনিটিভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আরও বড় আকারে পানি পরিশোধন প্ল্যান্ট স্থাপন এবং গ্রাম পর্যায়ে শক্তিশালী বিতরণ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারলে প্রান্তিক পর্যায়ের লক্ষাধিক মানুষ স্থায়ীভাবে এই হাহাকার থেকে মুক্তি পাবে।
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদ পারভেজ পরিস্থিতির গভীরতা ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন এখন আর আগের মতো নেই। অনিয়মিত বৃষ্টি আর তীব্র খরার কারণে শুধু বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করে এখন আর সারা বছর চলা প্রায় অসম্ভব। এজন্য, উপকূলীয় প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় সুপেয় পানি পৌঁছে দিতে আমরা ‘রিভার্স অসমোসিস’ (আরও) প্ল্যান্টের ওপর জোর দিচ্ছি। একটি রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ পরিবারের নিরবচ্ছিন্ন সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে সক্ষম। বর্তমানে চলমান প্রকল্পের পাশাপাশি চাহিদার ভিত্তিতে আমরা ধাপে ধাপে আরও প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছি।’আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই সেবার পরিধি বাড়িয়ে উপকূলের প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।