
আজকের সাতক্ষীরা দর্পণ ডেস্ক:
সাতক্ষীরার রাজনীতিতে এবার মূল চালকের আসনে তরুণরা। নতুন সীমানা নির্ধারণের পর জেলার চারটি সংসদীয় আসনে ভোটের সমীকরণ যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে ভোটারদের অগ্রাধিকারও। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন তরুণ। এই তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্তই এবার সাতক্ষীরার চার আসনের ফল নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরার চারটি আসনে মোট ভোটার ১৮ লাখ ৩২ হাজার ৭৭৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ১৭ হাজার ৮৪৮ জন, নারী ভোটার ৯ লাখ ১৪ হাজার ৯১৪ জন এবং অন্যান্য ১৩ জন। এই বিশাল ভোটার তালিকার একটি বড় অংশই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ, যাদের ভোটের ঝোঁক একদিকে গেলে ফল পাল্টে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
নতুন সীমানা অনুযায়ী সাতক্ষীরা-১ আসনে তালা ও কলারোয়া উপজেলা নিয়ে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৮৪৮ জন। এখানে পুরুষ ২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৭৩ জন, নারী ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৩ জন এবং অন্যান্য ২ জন। সাতক্ষীরা-২ আসনে সাতক্ষীরা সদর ও দেবহাটা উপজেলা নিয়ে মোট ভোটার ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৬৫৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৬৫ হাজার ৯৬৫ জন, নারী ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৫ জন এবং অন্যান্য ৪ জন। সাতক্ষীরা-৩ আসনে আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ২ হাজার ২২১ জন। এখানে পুরুষ ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৮৩ জন, নারী ২ লাখ ৪৮ হাজার ২৩৫ জন এবং অন্যান্য ৩ জন। উপকূলীয় সাতক্ষীরা-৪ আসনে শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে মোট ভোটার ২ লাখ ৯৮ হাজার ৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৫০ হাজার ২৭ জন, নারী ১ লাখ ৪৮ হাজার ২১ জন এবং অন্যান্য ৪ জন।
এই চার আসনেই তরুণ ভোটারদের সংখ্যা এতটাই উল্লেখযোগ্য যে, তাদের মতামত উপেক্ষা করে কোনো প্রার্থীর জয়ের আশা করা কঠিন। কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ সড়ক এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা ইত্যাদি বিষয়গুলোই এবার তরুণদের ভোটের প্রধান ইস্যু। তারা আর প্রতিশ্রুতির রাজনীতিতে ভরসা রাখতে চায় না, চায় কাজের হিসাব আর জবাবদিহিতা।
সাতক্ষীরা-১ আসনের কলারোয়ার উপজেলার তরুণ ভোটার হাবিবুর রহমান বলেন, “ভোট দেওয়ার পর জনপ্রতিনিধিকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না এই সংস্কৃতি আমরা বদলাতে চাই। আমাদের ভোট এক হলে ফল বদলানো কঠিন কিছু নয়।” তালায় আরেক তরুণ ভোটার গোবিন্দ কুমার রায় বলেন, উন্নয়ন আর কর্মসংস্থান যেখানে নিশ্চিত হবে, সেখানেই ভোট দিবো।
সাতক্ষীরা-২ আসনের সদরের কলেজশিক্ষার্থী আব্দুল হাফিজ বলেন, “ভোটার সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সুযোগ বাড়ছে না। ভালো হাসপাতাল, নিরাপদ চলাচল আর চাকরি এই তিনটাই আমাদের সবচেয়ে বড় দাবি।” সাতক্ষীরা সদর এলাকার তরুণ দিনা আক্তার বলেন, তরুণদের কথা যিনি গুরুত্ব দেবেন, তার পক্ষেই মাঠে নামবে তরুণ সমাজ।
সাতক্ষীরা-৩ আসনের আশাশুনি উপজেলার যুবক ও সাংবাদিক খায়রুল ইসলাম বলেন, “এখন তরুণরা প্রশ্ন করছে, হিসাব চাইছে। এই চাপটাই রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।” কালিগঞ্জেও উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে তরুণদের আলোচনা বাড়ছে।
অন্যদিকে, সাতক্ষীরা-৪ আসনের শ্যামনগরে তরুণদের প্রধান উদ্বেগ জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই কর্মসংস্থান। “ত্রাণ দিয়ে সমস্যা মেটে না। আমরা স্থায়ী সমাধান আর কাজের সুযোগ চাই। সাথে জলবায়ু সমস্যার সমাধান যিনি করতে পারবে তাকেই আমরা তরুণ প্রজন্ম ভোট দিবো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সীমানা নির্ধারণের সঙ্গে তরুণ ভোটারদের এই শক্ত অবস্থান প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের সক্রিয়তা রাজনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে, যেখানে প্রশ্নের উত্তর না দিলে আর পার পাওয়া যাবে না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনের ভবিষ্যৎ এবার অনেকটাই নির্ভর করছে তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর। মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই তরুণরা যদি সচেতনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে, তাহলে শুধু প্রার্থী নয়, সাতক্ষীরার রাজনীতির পুরো চিত্রই বদলে যেতে পারে।