
নিজস্ব প্রতিনিধি: শীত এলেই চায়ের কাপে উষ্ণতা খোঁজে মানুষ। ভোরের কুয়াশা, বিকেলের হালকা ঠান্ডা কিংবা রাতের শীতল হাওয়া-সব সময়েই এক কাপ চা যেন আলাদা স্বস্তি এনে দেয়। তার ওপর এবার শীত মৌসুমের মধ্যেই পড়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে আশাশুনিতে শীতের ঠান্ডা আর রাজনীতির উত্তাপ-দুটোই যেন জমে উঠেছে চায়ের কাপে। গ্রাম থেকে হাটবাজার, মোড় থেকে অলিগলি-সবখানেই চায়ের দোকান এখন রাজনৈতিক আড্ডার প্রাণকেন্দ্র।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন সামনে রেখে আশাশুনির প্রতিটি গ্রামগঞ্জে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। প্রার্থীদের চলছে কর্মী-সমর্থকদের ঘরোয়া প্রচার। এই প্রচারের ফাঁকে ফাঁকে ভোটারদের সঙ্গে বসে কথা বলার সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় জায়গা হয়ে উঠেছে চায়ের দোকান। এখানে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আলোচনা হচ্ছে দেশের রাজনীতি, স্থানীয় উন্নয়ন, প্রতিশ্রুতি আর সম্ভাবনার গল্প। নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে অনেক জায়গায় চা-নাস্তার আয়োজন করা হচ্ছে। প্রার্থীদের সম্মানে ভোটারদের বাড়িতেও চায়ের আপ্যায়ন বাড়ছে। কোথাও বিস্কুট, কোথাও রুটি-তবে সব আয়োজনের কেন্দ্রেই থাকছে চা। ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় শীত ও নির্বাচন মিলিয়ে চায়ের চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। উপজেলার বুধহাটা বাজারের ঠাকুরমোড় এলাকায় পাঁচটির বেশি চায়ের দোকানে ভোর ছয়টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে চা বিক্রির ধুম।
সকালে কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ আর দোকানিরা চায়ের দোকানে জড়ো হন দিনের শুরুতে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই যোগ দেন রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থকেরা। সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত জমে ওঠে নির্বাচনী আড্ডা। চা বিক্রেতারা বলছেন, একের পর এক অর্ডার সামলাতে গিয়ে অনেক সময় বসার ফুরসতই পাচ্ছেন না।
চা বিক্রেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সাধারণ সময়ে দিনে যেখানে ১৫০ থেকে ২০০ কাপ চা বিক্রি হতো, এখন সেখানে বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ কাপ পর্যন্ত। “নির্বাচনের সময় দোকান বন্ধ করার কথা ভাবতেই পারি না। অনেক রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতে হচ্ছে। নেতাকর্মী, সমর্থক আর সাধারণ মানুষ-সবার আনাগোনা লেগেই আছে,” বলেন তিনি। আগে সারাদিনে এক কেজি চা পাতা দিয়েই কাজ চলত। এখন লাগছে দুই কেজি পর্যন্ত। চিনির ব্যবহারও বেড়েছে অনেক। তাঁর ভাষায়, “এখন প্রতিদিন আগের তুলনায় দ্বিগুণ উপকরণ কিনতে হচ্ছে। তবে বিক্রি ভালো হওয়ায় খরচের চাপটা তেমন লাগছে না।” শুধু চা নয়, এর সঙ্গে বাড়ছে চিনি, দুধ, বিস্কুট ও রুটির চাহিদাও। এতে স্থানীয় পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরাও বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। নির্বাচনকেন্দ্রিক এই চা-সংস্কৃতি আশাশুনির অর্থনীতিতে ছোট পরিসরে হলেও একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
শহরের পাশাপাশি গ্রামেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের ছোট ছোট চায়ের দোকানগুলো এখন নিয়মিত আড্ডার জায়গা হয়ে উঠেছে। স্বল্প পুঁজিতে পরিচালিত এসব দোকান এই সময়ে ব্যবসার পরিধি বাড়াচ্ছেন অনেকেই। কোথাও অস্থায়ী বেঞ্চ বসানো হয়েছে, কোথাও দোকান বড় করে সাজানো হচ্ছে। শহুরে চা-পানের অভ্যাস গ্রামীণ জীবনযাত্রায় আরও গভীরভাবে ঢুকে পড়ায় চা এখন শুধু পানীয় নয়, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শীত আর নির্বাচন-এই দুইয়ে মিলে আশাশুনিতে চায়ের দোকানগুলো যেন অস্থায়ী রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে। কাপে কাপে চা, কথায় কথায় রাজনীতি-সব মিলিয়ে এই সময়টা চা বিক্রেতাদের জন্য যেমন ব্যস্ত, তেমনি লাভজনকও। নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, আশাশুনির চায়ের দোকানগুলোতে ততই বাড়বে ভিড়, বাড়বে আড্ডা, আর আরও বেশি চায়ের কাপে ঢালা হবে রাজনীতির গল্প।